নদী খননের মাটিতে চাপা আশ্রয়ণ প্রকল্প, ভেঙে যাচ্ছে শতাধিক গৃহহীনের স্বপ্ন

প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা দূর করা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি।

By
IBN News
A New York-based Media Outlet under IBN Inc. We are the Favorite Choice for the Global Bengali Community, We are Committed to delivering Unbiased News &...

খুলনা প্রতিনিধি: একসময় যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না, যারা কখনো রেললাইনের পাশে, কখনো অন্যের বারান্দায়, আবার কখনো খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হতেন, সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প তাদের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছিল। জমিসহ একটি ঘর পেয়ে তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন নিরাপদ ও স্থায়ী জীবনের। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, কাঁঠালতলা ও খর্নিয়া এলাকার তিনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক পরিবার বর্তমানে চরম আতঙ্ক ও দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। ভদ্রা নদী পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় নদী থেকে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ মাটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর পাশে এবং কোথাও কোথাও ঘরের গায়ের সঙ্গেই স্তূপ করে ফেলার কারণে ঘরবাড়ি ধসে পড়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে নদী খননের ফলে নদীর পাড় দুর্বল হয়ে পড়ায় অনেক ঘর নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদী খননের সময় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা কিংবা বসতঘরগুলোর স্থায়িত্বের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়নি। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল পাওয়ার আগেই এর ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসনের এই উদ্যোগ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনেক ঘরের চারপাশে বিশাল মাটির স্তূপ জমে ছোট ছোট পাহাড়ের মতো আকৃতি ধারণ করেছে। কোথাও ঘরের জানালা পর্যন্ত মাটিতে ঢেকে গেছে। আবার কোথাও ঘরের পেছনের দেয়াল মাটির চাপে হেলে পড়েছে। অনেক ঘরের দেয়াল ও মেঝেতে ফাটল দেখা দিয়েছে। কয়েকটি ঘরে মাটির চাপের কারণে বৃষ্টির পানি ও কাদা ঢুকে পড়ছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, নদী থেকে তোলা পলিমাটির প্রচণ্ড চাপে তাদের ঘরের পেছনের দেয়াল ও জানালা ভেঙে গেছে। মাটির বিশাল চাপ ঘরের মূল কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে। যে কোনো সময় পুরো ঘর ধসে পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

একজন বাসিন্দা বলেন, “ঘরের পাশে এত উঁচু করে মাটি ফেলা হয়েছে যে এখন ঘরের ভেতরে আলো-বাতাস পর্যন্ত ঠিকমতো আসে না। মাটি ভিজে গেলে আরও ভয় লাগে। মনে হয় যেকোনো সময় দেয়াল ভেঙে সবকিছু চাপা পড়ে যাবে।”

অপর এক নারী বাসিন্দা জানান, “রাতে ঘুমাতে পারি না। বৃষ্টি হলে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। কখন ঘর ভেঙে পড়ে, সেই চিন্তায় সন্তানদের নিয়ে সারাক্ষণ ভয়ে থাকি।”

পানির সংকট, ভেঙে পড়েছে স্যানিটেশন ব্যবস্থা: শুধু বসতঘর নয়, নদী খননের প্রভাব পড়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলোর ওপরও। কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য স্থাপন করা তিনটি টিউবওয়েলের মধ্যে দুটি ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে কয়েক ডজন পরিবারকে এখন একটি মাত্র টিউবওয়েলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী খননের সময় ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে এবং মাটির চাপে টিউবওয়েলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি টয়লেট ভেঙে পড়েছে অথবা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেছে।

খর্নিয়া এলাকার দিনমজুর আব্দুল মান্নান বলেন, “নদী কাটার সময় মেশিন দিয়ে ঘরের একদম গোড়া পর্যন্ত গর্ত করা হয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরগুলো নদীতে ধসে পড়বে। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। বাথরুম ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনটি পানি খাওয়ার কল ছিল, তার মধ্যে দুটি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন ২৬ পরিবারের একমাত্র ভরসা একটি টিউবওয়েল।”

তার মতে, আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাসকারী মানুষগুলো এমনিতেই আর্থিকভাবে অসচ্ছল। এখন পানির সংকট, স্যানিটেশন সমস্যা এবং বসতঘর হারানোর শঙ্কা তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

খোলা আকাশের নিচে আসবাবপত্র, সর্বস্ব হারানোর অপেক্ষা: কাঠালতলা ও খর্নিয়া এলাকার অনেক পরিবার ইতোমধ্যে তাদের ঘরের খাট, আলমারি, হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়চোপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাইরে সরিয়ে নিয়েছে। কারণ তারা মনে করছেন, যেকোনো সময় ঘর ধসে পড়তে পারে।

একাধিক পরিবার খোলা আকাশের নিচে তাদের সামান্য সম্পদ পাহারা দিচ্ছে। অনেকের মুখে একই প্রশ্ন—যদি ঘরটিও হারিয়ে যায়, তাহলে তারা কোথায় যাবে?

গৃহবধূ আমেনা বেগম বলেন, “অনেক কষ্টের পর একটা ঘর পেয়েছিলাম। এখন সেই ঘরও যদি চলে যায়, তাহলে সন্তানদের নিয়ে কোথায় থাকব? জোয়ার এলে ঘর বিলীন হয়ে যাবে, এই ভয় নিয়েই দিন কাটাচ্ছি।”

স্বপ্নের আশ্রয়ণ প্রকল্প আজ অনিশ্চয়তার মুখে: প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি, ২০ জুন এবং ২০২২ সালে পর্যায়ক্রমে ডুমুরিয়ার চুকনগর, খর্নিয়া ও কাঁঠালতলা এলাকায় শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়।

সরকারি খাস জমিতে নির্মিত দুই কক্ষবিশিষ্ট সেমি-পাকা ঘরগুলো হস্তান্তরের সময় আনন্দে কেঁদেছিলেন অনেক পরিবার। যারা বছরের পর বছর ভাসমান জীবন কাটিয়েছেন, তারা প্রথমবারের মতো পেয়েছিলেন নিজের নামে একটি ঠিকানা। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই স্বপ্ন আজ ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে।

১৩ হাজার কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্প: ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার যশোর ও খুলনা অঞ্চলের পাঁচটি নদী পুনঃখননের উদ্যোগ গ্রহণ করে। প্রকল্পের আওতায় হরিহর নদী ৩৫ কিলোমিটার, হরি-তেলিগাতি নদী ২০ কিলোমিটার, আপার ভদ্রা নদী ১৮.৫ কিলোমিটার, টেকা নদী ৭ কিলোমিটার এবং শ্রী নদী ১ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে।

মোট ৮১.৫ কিলোমিটার নদী পুনঃখননের এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে এ সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা দূর করা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি।

প্রশাসনের আশ্বাস: ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার স্বীকার করেছেন যে কাঠালতলা ও খর্নিয়া এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো নদী খননের মাটির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, “বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে ইতোমধ্যে কথা হয়েছে। তারা বিষয়টি অবগত রয়েছেন এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন।”

তিনি আরও বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বিষয়ে জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে। কিছু পরিবারকে অন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পে স্থানান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তবে তারা সেখানে যেতে রাজি হননি। তবুও ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কাজ করছে।”

প্রশ্নের মুখে উন্নয়ন ও পুনর্বাসন: স্থানীয়দের মতে, নদী খনন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়নের নামে যদি গৃহহীন মানুষের শেষ আশ্রয়টুকু হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

যে আশ্রয়ণ প্রকল্প একসময় ছিল নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নতুন জীবনের প্রতীক, আজ সেটিই আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শতাধিক পরিবার এখন প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে দেখছে তাদের স্বপ্নের ঘরটি এখনও টিকে আছে কি না। প্রশাসনের আশ্বাস মিললেও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

Share This Article
Follow:
A New York-based Media Outlet under IBN Inc. We are the Favorite Choice for the Global Bengali Community, We are Committed to delivering Unbiased News & an Accurate Portrayal of Global Events.
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version