নিজস্ব প্রতিবেদক: আবার চালু হয়েছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআ’তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ-জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমানের মাদ্রাসা। তার গ্রেফতারের পর বন্ধ হয়ে পড়া মাদ্রাসাটি রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগে ২০ বছর পর আবার চালু করা হয়েছে।
ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা এই জঙ্গি নেতার ভাই ওবায়দুর রহমান বর্তমানে মাদ্রাসাটি চালাচ্ছেন। তিনি নিজেও জেএমবি সম্পৃক্ততার মামলায় এক যুগেরও বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন।
জামালপুর শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার তিতপল্লা ইউনিয়নের চরশী খলিফা পাড়ার চরশী হাবিরুন্নেসা হাফিজিয়া মাদ্রাসাতে শিক্ষকতা করতেন শায়খ রহমান। সে সময় এখানে জঙ্গি প্রশিক্ষণ চলত বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। ১৯৭৫ সালে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তার বাবা আব্দুল্লাহ ইবনে ফজল ওরফে ফজল মুন্সী। শায়খ আব্দুর রহমান ছাড়াও তার ভাই আতাউর রহমান সানিও ছিলেন জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতা।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট মুন্সীগঞ্জ বাদে দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলার পর জেএমবির নাম সামনে এলেও এটি গঠন হয় আরও বছর সাতেক আগে। এই দলটিই রাজশাহীর বাগমারায় উগ্র বামপন্থীদের দমনের নামে ঘটিয়েছিল অনেকগুলো নৃশংস হত্যাকাণ্ড।
তখন শায়খ রহমান ও তার ডেপুটি সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাইকে নিয়ে সারদেশে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার শুরুতে বাংলা ভাইদের অস্তিত্ব অস্বীকার করলেও পরে অভিযানে নামে। শায়খ রহমান, তার ভাই আতাউর রহমান সানি, বাংলা ভাই, খালেদ সাইফুল্লাহ ও সালাহউদ্দিনের ফাঁসির আদেশও আসে। ২০০৭ সালের মার্চ মাসে কার্যকর করা হয় সেই রায়।
সে সময় বন্ধ হয়ে যায় মাদ্রাসাটি। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাস ছয়েকের মধ্যে ২০২৫ সালের শুরুতে সেটির কার্যক্রম শুরু করেন ওবায়দুর রহমান। তিনি সেখানকার পরিচালক পদে আছেন। প্রধান শিক্ষক হিসেবে রয়েছেন মো. জাকারিয়া হোসেন নামে একজন। আর ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে আছেন টাঙ্গাইল জেলার একটি মাদ্রাসার ভাইস-প্রিন্সিপাল মো. আমিনুল ইসলাম।
প্রায় এক একর জমির ওপর নির্মিত মাদ্রাসাটির প্রবেশ পথে দেখতে পাওয়া যায় একটি পুরনো মসজিদ। এরপরেই তিনটি হাফ বিল্ডিং ভবন, যার একটিতে অফিস কক্ষ, বাকি দুটিতে চলে পাঠদান।
গত শনিবার সেখানে দেখা মেলে কয়েকজন শিক্ষার্থীর। মাদ্রাসার মাঠে ধান শুকানোর কাজ করছিলেন একজন নারী ও একজন পুরুষ।
সহকারী শিক্ষক মো. রাকিব জানান, সেখানে প্রাক প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চলে। শতাধিক শিক্ষার্থীকে বাংলা ও নূরানী পদ্ধতিতে পাঠদান করা হয়। মাসিক বেতন ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
সহকারী পরিচালক মো. শাহজামাল জানান, মাদ্রাসাটিতে ১১ জন কর্মী আছেন। এদের মধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ পুরুষ শিক্ষক চার জন, তিনজন সহকারী শিক্ষক, যাদের সবাই নারী এবং বাকিরা স্টাফ। প্রত্যেকেই এই এলাকা বা আশেপাশের বাসিন্দা।
প্রধান শিক্ষক মো. জাকারিয়া হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘২০০০ সালের দিকে বেশ সরগরম ছিল মাদ্রাসাটি। তবে সে সময় এই মাদ্রাসার শিক্ষক বা শিক্ষার্থী কেউই এই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন না। তারা বাইরের লোকজন ছিলেন। তখন মাদ্রাসায় কেউ প্রবেশ করতে পারত না। তাই দেখতে বা বুঝতে পারত না মাদ্রাসার ভেতরে কী হচ্ছে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন শায়খ আব্দুর রহমান।’
বছর দুয়েক আগেও না জানিয়ে মাদ্রাসা খুললে পুলিশ চলে আসতো জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানের চিত্র ও প্রেক্ষাপট পুরোটাই উল্টো। ‘এখন মাদ্রাসার গেইট বা দরজা সবসময় খোলা থাকে।’
মাদ্রাসার পরিচালক এবং শায়খ আব্দুর রহমান ও আতাউর রহমান সানির ভাই ওবায়দুর রহমানের নম্বরে কল করা হলে তার স্ত্রী সাবিনা খাতুন সেটি রিসিভ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী দীর্ঘ ১৩টি বছর কারাগারে ছিলেন। আমাদের সঙ্গে এক ব্যক্তির জমি নিয়ে কিছু বিরোধ চলছে। তাই তিনি এই মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে অতীত ইতিহাস টেনে অনেক কিছু রটানোর চেষ্টা করছে।’
এই কথোপকথনের মধ্যে ফোন ধরেন ওবায়দুর রহমানও। কার অনুমতিতে মাদ্রাসাটি চালু হয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসাটি কেউ বা কোনো কর্তৃপক্ষ বন্ধ করেনি। তাই চালুর সময়ও কারও অনুমতি নেওয়া হয়নি।’ এলাকার লোকজনের দানের পাশাপাশি কিছু সরকারি সহায়তা পাওয়ার কথাও বললেন ওবায়দুর।
