এস এম জহিরুল ইসলাম বিদ্যুৎ: থানায় সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষের হয়রানি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী। অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তাঁর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবে গত কয়েক মাসে রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার, ফতুল্লা ও বন্দর থানার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বদলি, প্রত্যাহার ও প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
জেলা পুলিশের এমন কঠোর ও সাহসী অ্যাকশনে শুধু পুলিশ বাহিনীই নয়, নারায়ণগঞ্জের সর্বমহলে স্বস্তি ফিরেছে এবং এসপির এই উদ্যোগ ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। মাদক, বাল্যবিবাহ, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই’সহ অপরাধ দমনে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধ দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। জেলায় অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনবান্ধব পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্থানীয় সংগঠন ও গণমাধ্যমের কাছেও প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।
পুলিশ সূত্র জানায়, বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর গত কয়েক মাসে পরপর চারটি থানায় বড় ধরনের রদবদল ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আড়াইহাজার থানা: গত ৯ জুন রাতে চাঁদাবাজি ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগে উপ-পরিদর্শক (এসআই) হাসনাঈন আহমেদকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়।
বন্দর থানা: গত ৭ জুন দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে এসআই মাসুদ রানাকে প্রত্যাহার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বন্দরে ছুরিকাঘাতে নিহত এক যুবকের পরিবার মামলা করতে গেলে তিনি ঘুষ দাবি করেছিলেন। এছাড়া, গত ৮ জুন আরও তিন এসআই মনির হোসেন, শহিদুল ইসলাম ও ফারুককে বদলি করা হয়। গণমাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেও বন্দর থানার ওসি গোলাম মুক্তার আশরাফ উদ্দিন জানান, এটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, মাদক সংশ্লিষ্টতা এখনও প্রমাণিত হয়নি।
ফতুল্লা মডেল থানা: গত ৬ মে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় (দেওভোগ হাশেমবাগ) পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে হাতকড়াসহ ৫ আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার দায়ে ফতুল্লা মডেল থানার ৬ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন এসআই আবুল বাশার, এএসআই আশিক এবং চারজন কনস্টেবল।
রূপগঞ্জ থানা: এর আগে গত ১৫ মার্চ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগে রূপগঞ্জ থানার তিন এসআই হুমায়ুন আহমেদ, আহসানউল্লাহ ও নাদিরুল ইসলামকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মুন্সী বলেন: “যাদের বদলি করা হয়েছে, তার কিছু স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতে হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। জনগণকে মানসম্মত সেবা দিতে পুলিশ কাজ করছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।”
সেবাপ্রার্থীদের উদ্দেশে এসপি আরও বলেন, “থানায় সেবা নিতে এসে কেউ হয়রানির শিকার হলে সরাসরি আমাকে জানাবেন। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত যেই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছি। ভালো কাজের জন্য যেমন পুরস্কৃত করা হবে, তেমনি মন্দ কাজের জন্য তিরস্কার ও শাস্তি অব্যাহত থাকবে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মাদক কারবারিদের সঙ্গে সখ্যতা ছাড়াও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন থানায় ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছিল। জেলা পুলিশ জানিয়েছে, সেবার মান নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রয়োজনে ফৌজদারি মামলাও করা হবে।
এসপি মিজানুর রহমান মুন্সীর এই কঠোর ও ইতিবাচক অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় সাংবাদিক, সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষ। তাদের মতে, পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে এই ধরনের সাহসী উদ্যোগ সময়ের দাবি ছিল।
