মতামত কলাম: প্রথম আলোর দিনবদল -মির্জা গালিব উজ্জ্বল
২০০১ থেকে ২০২৪—সুদীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব ও প্রচার সংখ্যার দিক থেকে একধরনের একক আধিপত্য বজায় রেখেছিল দৈনন্দিন ‘প্রথম আলো’। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ওঠানামা করলেও সংবাদমাধ্যমটির কার্যালয় বা প্রতিষ্ঠানে আঘাত হানার মতো ঘটনা সহজে ঘটেনি। ২০০৫ সালে জামায়াতে ইসলামীর ঘেরাও কর্মসূচির মুখোমুখি হলেও তৎকালীন সম্পাদক মতিউর রহমানের প্রশাসনিক সুরক্ষা কিংবা প্রভাবের প্রাচীরে ফাটল ধরেনি। বিগত আওয়ামী সরকারের টানা ১৭ বছরের শাসনকালে নানা সমালোচনা থাকলেও প্রথম আলো তাদের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক নিরাপত্তা পেয়ে এসেছে। সরকারি বিজ্ঞাপন প্রাপ্তি কিংবা সর্বোচ্চ বিক্রি হওয়া কাগজের তকমা বজায় রাখতে তাদের কোনো বাধা পেরোতে হয়নি।
তবে ২০২৪ পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই ছক অনেকটাই ওলটপালট হয়ে গেছে। জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যমটির সম্পাদকীয় ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন ও অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে। গতকাল যে সংবাদমাধ্যমটি ক্ষমতা ও প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক মহলের শক্তির ওপর ভর করে নিজেদের রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ামক ভেবে এসেছিল, আজ তারাই নতুন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল প্রথম আলোর জন্য বরাবরই একটি বড় হাতিয়ার ছিল। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো বারবার মার্কিন প্রভাব ও খবরদারির বিষয়ে সতর্ক করলেও প্রথম আলো সেই সমীকরণকে নিজেদের সুবিধার্থেই ব্যবহার করেছে। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পুরনো শিক্ষাটি আজ আবারও স্পষ্ট—আমেরিকার রাজনৈতিক বন্ধুত্ব স্থায়ী স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল। স্বার্থের সমীকরণ বদলাতেই সেই সখ্যতায় এখন ভাটার টান সুস্পষ্ট।
সবচেয়ে বড় আয়রনি তৈরি হয়েছে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থায়। যে প্রভাবশালী মহল বা ব্যক্তিত্বদের ওপর আস্থা রেখে প্রথম আলো নিজেদের রাজনৈতিক ন্যারেটিভ সাজিয়েছিল, বর্তমান প্রশাসনিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সেই প্রথম আলোকেই আজ বয়কট, আক্রমণ ও হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও যে পত্রিকাটিকে প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা ও সুরক্ষার বলয়ে রাখা হয়েছিল, আজ সেই সংবাদপত্রটিই নতুন শাসন ব্যবস্থার সরাসরি আক্রোশ ও সামাজিক বয়কটের শিকার।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নীতি অনুযায়ী প্রতিটি পত্রিকার নাগরিক অধিকার ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সুবিধাবাদ ও পক্ষপাতমূলক সাংবাদিকতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা আজ সংবাদমাধ্যমটির নিজের জন্যই এক বড় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনের এই অস্থিরতা, সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ এবং রাজনীতিতে ডানপন্থী দলগুলোর আধিপত্য দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চিত মোহনায় নিয়ে যাচ্ছে।
প্রথম আলো হয়তো ভেবেছিল রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়ে তারা নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—রাজনীতির মাঠে সাময়িক সুবিধাবাদের পরিণতি কখনোই দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেয় না। সরকারি আক্রমণ ও সামাজিক বয়কটের মুখে পড়ে প্রথম আলো আজ যে সংকটে পড়েছে, তা কেবল একটি সংবাদপত্রের সংকট নয়; বরং দেশের গণমাধ্যম ও রাজনীতির এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার প্রতিচ্ছবি।

