মিনহাজ হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি (ইতালি): রোম মহানগর এলাকায় বিদেশি কমিউনিটির অধিকার, অংশগ্রহণ ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার করতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে আন্তঃসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের স্থায়ী পরামর্শ পরিষদ (Consulta Permanente della Convivenza Interculturale)।
রাজধানী রোমের Istituzionale della Città Metropolitana di Roma Capitale কার্যালয়ে আয়োজিত প্রথম উন্মুক্ত অধিবেশনে রোমের মেয়র ও রোম মহানগর এলাকার মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরির উপস্থিতিতে এ পরিষদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এটি নাগরিক, বিভিন্ন সংগঠন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক সংগঠন, তৃতীয় খাতের সংস্থা, বিদেশি কমিউনিটি এবং নতুন নাগরিকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের কাজ ও পারস্পরিক সম্পর্কের ফসল। মেয়র গুয়ালতিয়েরির ভাষায়, এটি শুধু একটি অর্জন নয়; বরং নতুন যাত্রার সূচনা।
এই পরিষদ হবে যৌথ অংশগ্রহণ ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি স্থায়ী মঞ্চ। এর মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজন ও সমস্যা চিহ্নিত করা, পারস্পরিক সংলাপ বাড়ানো এবং সামাজিক নীতি প্রণয়নে অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হবে। রোম ও আশপাশের মহানগর এলাকায় বসবাসরত ৬ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি বিদেশি নাগরিকের জন্য পরিষেবার মান উন্নত করা এবং তাঁদের অধিকার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখা এর অন্যতম লক্ষ্য।
২০২৩ সাল থেকে এ পরামর্শ পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া শুরু হয়। এতে ৯টি কর্মদল কাজ করেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, আবাসননীতি এবং অভ্যর্থনা ও আশ্রয়ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা হয়েছে। পরিষদের ভবিষ্যৎ কাজের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা, সাংস্কৃতিক মধ্যস্থতা ও ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা দূর করা, আবাসনের অধিকার বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানে প্রবেশাধিকার সহজ করা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সরলীকরণ, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তি এবং শিশুদের অধিকার সুরক্ষা।
অনুষ্ঠানে পরিষদের বর্তমান ৭৪টি সদস্য সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। রোম ক্যাপিটাল প্রশাসনসহ মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৫টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত বাংলাদেশি সংগঠন রয়েছে সাতটি—বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন অ্যাসোসিয়েশন (বিমাস), ইসলামিক ইনস্টিটিউট অফ রোম, মুসলিম কমিউনিটি সেন্টার, অ্যাসোসিয়েশন কলতুরালে ইসলামিকা দেল বাংলাদেশ আল আকসা, উলামা কাউন্সিল অফ ইতালি, সঞ্চারী সঙ্গীতায়ন এবং সর্বজনীন শ্রী শ্রী রাধা কৃষ্ণ মন্দির।
অনুষ্ঠানে মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরি ও মহানগর পরিষদের কাউন্সিলর তিজিয়ানা বিয়োলঘিনির পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন রোম ক্যাপিটালের সিটি কাউন্সিলের সভাপতি স্বেতলানা চেল্লি, ইউএনএআর-এর পরিচালক মাত্তিয়া পেরাদোত্তো, ইকুয়েডর ও সিয়েরা লিওনের কনসালসহ আন্তঃসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের কর্মদলগুলোর প্রতিনিধিরা। উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণকারী সংগঠনের মধ্যে ছিল এআরসিআই রোমা, এএনওএলএফ, স্লো ফুড রোমা, কমিউনিটা সিয়েরা লিওনে নুওভে জেনেরাজিওনি এবং অ্যাসোসিয়েশন কমিউনিটা পেরুভিয়ানা।
মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরি বলেন, এই পরামর্শ পরিষদের প্রতিষ্ঠা একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। এর মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপকে স্থায়ী এবং কাঠামোগত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এটি শুধু মানুষের কথা শোনার স্থান নয়; বরং ধারাবাহিক আলোচনা, সহযোগিতা এবং বর্তমান সমাজের জটিল বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি প্রণয়নের স্থায়ী প্রক্রিয়া। রোম ও এর মহানগর এলাকা বহুদিন ধরেই বিভিন্ন মানুষ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির মিলনস্থল। এই বৈচিত্র্যকে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির মাধ্যমে কাজে লাগাতে হবে।
রোম মহানগর পরিষদের সমান সুযোগ, সামাজিক নীতি, সংস্কৃতি ও অংশগ্রহণবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্সিলর তিজিয়ানা বিয়োলঘিনি বলেন, নাগরিকদের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নীতি গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, প্রায় তিন বছর আগে মেয়র গুয়ালতিয়েরির সঙ্গে এ লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু হয়। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠনকে একত্র করে এমন একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে, যা বাস্তব ও অনুভূত বৈষম্য দূর করতে এবং বিদেশি নাগরিকদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিস্থিতি এবং অভিবাসী অধিকার সংকুচিত হওয়ার এই সময়ে রোমকে সত্যিকার অর্থে বহুসাংস্কৃতিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

