পাতাল-উড়াল মেট্রোরেলের দুই লাইনের নির্মাণে প্রশাসনিক জটিলতা: দ্রুত কাজ শুরুর আহবান জাপান দূতাবাসের

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) দূতাবাসের সম্প্রতি পাঠানো চিঠিতে সরকারের প্রতি দ্রুত কাজ শুরুর জন্য জরুরি আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ঋণের অর্থ ব্যয় না হলে জাপানের ঋণ শৃঙ্খলায় সমস্যা দেখা দিতে পারে।

By
IBN News
A New York-based Media Outlet under IBN Inc. We are the Favorite Choice for the Global Bengali Community, We are Committed to delivering Unbiased News &...
ছবি: সংগৃহীত।

ঢাকা, ২৪ অক্টোবর ২০২৫ : ঢাকার যানজটমুক্তকরণের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে নির্মাণাধীন পাতাল ও উড়াল মেট্রোরেলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ লাইন—এমআরটি-১ এবং এমআরটি-৫ (উত্তর)—প্রশাসনিক জটিলতা ও ব্যবস্থাপনামূলক ত্রুটির কারণে অনিশ্চিততার মুখে পড়েছে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) দূতাবাসের সম্প্রতি পাঠানো চিঠিতে সরকারের প্রতি দ্রুত কাজ শুরুর জন্য জরুরি আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ঋণের অর্থ ব্যয় না হলে জাপানের ঋণ শৃঙ্খলায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। এদিকে, ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানী লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধে অযোগ্যতা, অনিয়মিত নিয়োগ ও কর্মকর্তাদের অন্যায় বরখাস্তের অভিযোগ উঠেছে, যা প্রকল্পের অগ্রগতিতে আরও বাধা সৃষ্টি করছে বলে দাবি করা হয়েছে।

ঢাকা থেকে আইবিএন নিউজের সিনিয়র সাংবাদিক নূরুল আলম আজাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচির স্বাক্ষরিত চিঠিতে প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব, অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ, সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকে আহ্বান জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রশাসনিক ও বিত্তগত জটিলতায় প্রকল্প দুটির বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়েছে, যার ফলে জাপানি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা ও নির্ধারিত ঋণের অর্থ অব্যবহৃত হয়ে যাচ্ছে। জাইকা জোর দিয়ে বলেছে, এই অর্থগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আলাদা রাখা হয়েছে, এবং ব্যবহার না হলে ঋণের শর্তসমূহ পরিবর্তনের ঝুঁকি রয়েছে।

প্রকল্প দুটির বিবরণে, এমআরটি-১ (হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন পর্যন্ত) ৩১.৫৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা দুটি অংশে বিভক্ত: বিমানবন্দর রুট (১৫.৫২৬ কিমি, ১২টি পাতাল স্টেশন) এবং পূর্বাচল রুট (১৬.০১৬ কিমি, ৭টি উড়াল ও ২টি পাতাল স্টেশন)। মোট পাতাল অংশ ১৭.৪৫০ কিমি এবং উড়াল অংশ ১২.৩১৪ কিমি। এই রুটে নদ্দা ও নতুন বাজার স্টেশনের মাধ্যমে দুই অংশের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হবে। চালু হলে দৈনিক ৮ লক্ষ যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। অন্যদিকে, এমআরটি-৫ (উত্তর) হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিমি দীর্ঘ, যার মধ্যে ১৩.৫ কিমি পাতাল এবং বাকি উড়াল। মোট ১৪টি স্টেশনের মধ্যে ৯টি পাতাল এবং ৫টি উড়াল। প্রকল্পটির জন্য জাইকা ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে, এবং এমআরটি-১-এর জন্য ৫৪ কোটি ডলার। উভয় প্রকল্পই ২০১৯ সালে অনুমোদিত হয়, এবং ২০৩০ (এমআরটি-১) ও ২০২৮ (এমআরটি-৫) সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে শুধু ডিপো উন্নয়নের কাজ চলছে, মূল নির্মাণ শুরু হয়নি।

প্রকল্পের বিলম্বের পেছনে প্রশাসনিক জটিলতা প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ডিএমটিসিএল-এর রিপোর্ট অনুসারে, এমআরটি-১-এর ১২টি প্যাকেজের মধ্যে মাত্র একটির ঠিকাদার নির্ধারিত, বাকি ১১টির টেন্ডার এখনও চলছে। এমআরটি-৫-এর ১০টি প্যাকেজের মধ্যে একটি ছাড়া বাকিগুলোর টেন্ডার অসম্পূর্ণ। উচ্চ ঠিকাদারের দর, বোর্ডের অনুমোদন বিলম্ব, মুদ্রাস্ফীতি-জনিত খরচ বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনবলের অভাব এসবের মধ্যে রয়েছে। জাইকার চিঠিতে বলা হয়েছে, এই বিলম্বের ফলে ঢাকার নগর যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে ছয় বছরের সময় নষ্ট হয়েছে।

এদিকে, ডিএমটিসিএল-এর এমডি ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, তাঁর অযোগ্য ব্যবস্থাপনার কারণে প্রকল্পগুলো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তিনি সংস্থার সিনিয়র কর্মকর্তাদের পরামর্শ উপেক্ষা করে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত জিএম-অ্যাডমিন নাসির উদ্দিন তরফদার, জিএম-ফাইন্যান্স কামাল আনোয়ার, জিএম-পিও রমজান আলী, জিএম অপারেশন ইফতেখার আহমেদ এবং ডাইরেক্টর অপারেশন নাসির উদ্দিন আহমেদের পদ শূন্য ঘোষণা করে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। এছাড়া, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ছাড়াই অপকর্মে জড়ানোর অস্বীকৃতির কারণে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনটি প্যাকেজের ঠিকাদাররা ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ শুরুর অপেক্ষায় আছেন, কিন্তু এমডির নির্দেশে চুক্তিগুলো বাতিলের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ। এমনকি, এমআরটি-১-এর অফিস আগারগাঁও থেকে দিয়াবাড়ীতে স্থানান্তর করে প্রকল্পের গতি কমানোর চক্রান্ত চলছে।

অভিযোগকারীরা আরও বলেছেন, ফারুক আহমেদের নিয়োগই অবৈধ। তিনি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর ৫৭ নং ধারা লঙ্ঘন করে চুক্তিভিত্তিক পদে যোগ দিয়েছেন। তাঁর আবেদনে মিথ্যা ও বিভ্রান্তকর তথ্য প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, তিনি অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্ট (নং RA6237296) ও ভারতীয় আধার কার্ড (নং ২৬৬৬২০৯১৯১৬২) ধারী, এবং বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র নং ৭৩০৬০২৪২২০। এই নিয়োগের পেছনে কার স্বার্থ কাজ করেছে, তা তদন্তের দাবি করা হয়েছে। জাতীয় স্বার্থজড়িত এই প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তার নিয়োগের মাধ্যমে সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করা উচিত বলে মত প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএমটিসিএল-এর এমডি ফারুক আহমেদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টায় তারা সাড়া দেননি। তবে, সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি এমআরটি-৫ (উত্তর)-কে “ভালো অবস্থায়” বলে দাবি করেছেন এবং ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকল্পের সাথে জড়িত সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এই অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রকল্পের গতি বাড়ানো জরুরি, অন্যথায় ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠবে।

Share This Article
Follow:
A New York-based Media Outlet under IBN Inc. We are the Favorite Choice for the Global Bengali Community, We are Committed to delivering Unbiased News & an Accurate Portrayal of Global Events.
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version