নিজস্ব প্রতিবেদক: গত মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬, বিকাল সাড়ে ৭টায় নিউইয়র্কের জ্যামাইকা ষ্টার কাবাব রেষ্টুরেন্টে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীন বাংলার অন্যতম রূপকার, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং নিউক্লিয়াস ও বিএলএফ-এর প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল আলম খানের তৃতীয় প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে সিরাজুল আলম খান স্মৃতি পরিষদ, নিউইয়র্ক এই সভার আয়োজন করে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ডা. মুজিবুল হক এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক শাহাব উদ্দীন।
সভার শুরুতে সিরাজুল আলম খানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। এছাড়াও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাসহ আজ পর্যন্ত সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সভায় সিরাজুল আলম খানের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও ব্যক্তি জীবন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা তাঁর মেধা, লেখাপড়া ও আজীবন মানুষের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ হিসেবে কাজ করার কথা তুলে ধরেন। ১৯৬৩ সালের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদের পর তিনি আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসেননি, তবে সবসময় মূল সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৬৩ সালে আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমদকে নিয়ে ‘স্বাধীন বাংলার নিউক্লিয়াস’ গঠন তাঁর দূরদর্শী চিন্তারই প্রতিফলন। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিএলএফ গঠন করে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিলেন তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁদের চিন্তার ফলেই পাকিস্তানের আপোষকামী ধারা থেকে বেরিয়ে বাঙালির মুক্তির জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হয় এবং সাম্য, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মূল্যবোধ ইত্যাদি সংযোজন করে মুজিবনগর সরকারের পক্ষ থেকে “ডিকলারেশন অব ইনডিপেনডেন্স” ঘোষণা করা হয়েছিল।
স্বাধীনতার পর দুর্নীতিবাজ আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে দেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে একটি বিপ্লবী জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান। কিন্তু তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকার ও আওয়ামী লীগ তাঁর কথা শোনেনি, বরং সেই পুরোনো প্রশাসন দিয়ে দেশ শাসন শুরু করে। যারা এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তারা বঙ্গবন্ধুর বিরাগভাজন হন। যার কারণেই ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর জাসদের জন্ম হয়। পথহারা সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ ও জাসদের অস্থির রাজনীতির কারণে আজ স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর পরেও দেশকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি বলে বক্তারা মত দেন। যেখানে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া সহ অনেক দেশ আমাদের পরে স্বাধীন হয়েও অনেক উন্নত, সেখানে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ইতিহাস ও ন্যুনতম প্রতিষ্ঠা হয়নি। বরং ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিয়ে ১৯৭১ সালের পরাজিত শত্রুরা ক্ষমতায় আসার পায়তারা করছে।
সিরাজুল আলম খান জাতির দিকনির্দেশনা দিতে বিভিন্ন সময় লেখনীর মাধ্যমে তাঁর রাষ্ট্র চিন্তা প্রকাশ করেছেন। ক্ষমতাশীলদের হীনমন্যতার কারণে তাঁর চিন্তাধারাকে আমলে নেওয়া হয়নি। তা নাহলে নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে তিনি রাষ্ট্র কাঠামো ও শাসন ব্যবস্থা সম্বলিত ১৪ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিলেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল জাতীয় সংসদে দু-কক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট (৩০০+২০০ মোট ৫০০ আসনের), রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, সংবিধানের ৭০ ধারা সহ কালাকানুন বাতিল করে সংবিধান সংস্কার, বাংলাদেশকে ৭/৯টি প্রদেশে বিভক্ত করে আমলাতন্ত্রমুক্ত, নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বারা দেশ পরিচালনা, নির্বাচনকালীন সরকার, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন, স্থায়ী জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন, মাইক্রোক্রেডিট এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের প্রস্তাব। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নাম না বলে (দাদার) কিছু দফার আলোচনা করলেও বর্তমান বি এন পি সরকার তা বাস্তবায়নের কোন পদক্ষেপ নিবে বলে মনে হয় না। এই সরকারও সেই পুরোনো পথেই হাঁটছে এবং তাদের সুবিধাজনকভাবে রাষ্ট্রকে জনগণের শোষণ ও নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চিরস্থায়ী ক্ষমতায় থাকার জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছে।
বক্তারা বলেন, মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয় এবং সিরাজুল আলম খানও ব্যতিক্রম ছিলেন না। তবে তাঁর জীবনের ভালো দিকগুলো আলোচনা ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। তিনি কখনোই ভোগের রাজনীতি করেননি, ত্যাগের রাজনীতির এক আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবেন। ঢাকার একটি সাধারণ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর কোন বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, পরিবার বা উত্তরাধিকার কিছুই রেখে যাননি। রেখে গেছেন শুধু বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ। তাঁর অছিয়ত অনুযায়ী, “কোন শোক সভা নয়, পুষ্পমাল্য বা শহীদ মিনারে লাশের ডিসপ্লে নয়, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গার্ড অব অনারও চাননি। শুধু মায়ের একটা সাদা শাড়ি দিয়ে মুড়ে গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার কবরের পাশে যেন পুঁতে দেওয়া হয়”। এবং তাই হয়েছে। এই ধরণের ক্ষণজন্মা মানুষের ইতিহাস আমাদের স্কুল, কলেজ ও পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন করা অত্যন্ত জরুরি। তবেই আগামী প্রজন্ম খাঁটি দেশপ্রেমিক হয়ে গড়ে উঠবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান, মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত বিশ্বাস, লিগেল কনসালটেন্ট অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান, সাপ্তাহিক ঠিকানার প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ ফজলুর রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট সাঈদ তারেক, অধ্যাপক ও কলামিস্ট হুসনে আরা, বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক ও লায়ন হাকিকুল ইসলাম খোকন, জেএসএফ সংগঠক হাজী আনোয়ার হোসেন লিটন, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও কবি ছালেহা ইসলাম, অধ্যাপক শেখ মিজান, আজিজুর রহমান, এম আব্দুল কাদের, দীপন গাজী, এম নজরুল ইসলাম, আবুল হোসেন, আব্দুর রহিমসহ আরও অনেকে।
সভায় সর্বসম্মতিক্রমে বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মতিউর রহমানকে সভাপতি এবং হাজী আনোয়ার হোসেন লিটনকে সম্পাদক করে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট ‘সিরাজুল আলম খান স্মৃতি পরিষদ, নিউইয়র্ক’ এর আগামী দুই বছরের জন্য কমিটি গঠন করা হয়।
সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে নৈশভোজের মাধ্যমে সভা শেষ হয়। নবনির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বাপসনিউজকে জানান, তাঁরা অতিশিগগিরই একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি ও একটি শক্তিশালী উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করবেন।
