নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও জুলাই ছাত্র-জনতা হত্যাকাণ্ডের চার্জশিটভুক্ত আসামি ও রাউজানের আলোচিত ব্যক্তি ফারাজ করিম চৌধুরীকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে প্রকাশ্যে দেখা যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি কয়েকদিন আগে গোপনে দেশ ত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে। কিভাবে, কত টাকার বিনিময়ে এবং কার সহযোগিতায় তিনি দেশ ছাড়লেন? তা এখন দুবাই প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি জনমনে নতুন করে উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুবাই প্রবাসী কয়েকজন বাংলাদেশি ফোনে জানান, শহীদ নুরুল আলম নুরু, শহীদ ওয়াসিম, জাফর চেয়ারম্যান ও শ্রীকান্ত রক্ষিতসহ একাধিক হত্যা মামলার আসামি হিসেবে আলোচিত সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর নানা অপকর্মের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তার বড় ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী। বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করে তিনি দেশবিরোধী নানা তৎপরতায় যুক্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রবাসী সূত্রের দাবি, ফারাজ করিম চৌধুরী, সাইদুল ইসলাম এবং রাউজানের শীর্ষ সন্ত্রাসী আকতারসহ কয়েকজন মিলে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা লিকু ও কথিত অস্ত্র ব্যবসায়ী জাবেদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গত ১৭ এপ্রিল ওই বৈঠকের কয়েকটি ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বৈঠকে উপস্থিত এক প্রবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, রাউজান ও চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার বিষয়ে সেখানে নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রবাসী সূত্র আরও জানায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আসামি ফজলে করিম চৌধুরীকে মুক্ত করার জন্য আমিরাতপ্রবাসী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। সেই অর্থ ব্যয় করে বিদেশি বিতর্কিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে তার পক্ষে সমর্থন আদায়ের পরিকল্পনাও করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে রাউজানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও আলোচনায় আসে বলে দাবি করা হয়।
এদিকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ফারাজ করিম চৌধুরীর বিদেশ যাত্রা দেশের বিমানবন্দর প্রশাসনের দুর্নীতির ইঙ্গিত বহন করে বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপির চট্টগ্রাম জোনের কয়েকজন নেতা। তারা এ বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি প্রবাসী নেতারা বিষয়টি নিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার পাশাপাশি দুবাইয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল ও আবুধাবিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রামের প্রবাসী কয়েকজন নাগরিক আরও জানান, দীর্ঘ দুই দশক ধরে রাউজান যেন একটি ব্যক্তিনির্ভর শাসনের অধীনে ছিল। সেই সময়কার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোয় তাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলে তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাউজানের হাজিপাড়ায় জুমার নামাজ পড়তে গিয়ে বিএনপি নেতা মুসা নিহত হওয়ার ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ফজলে করিমের অনুসারীরা মুসাকে মসজিদ থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরোধিতা করাই ছিল তার ‘অপরাধ’। একইভাবে ২০১০ সালে বাগোয়ান ইউনিয়নের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু জাফরকে অপহরণের পর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে সেই গুমের ঘটনাও আলোচনায় আসে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামের মুরাদপুর, বহদ্দারহাট ও নিউমার্কেট এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর ব্রাশফায়ারের অভিযোগও ওঠে ফজলে করিমের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। সেই সময় ব্যবহৃত অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়েছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বর্তমানে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা চলমান রয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, বিদেশি কিছু ব্যক্তি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ফজলে করিমকে ‘নির্দোষ’ প্রমাণের একটি প্রচার কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে তার ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী বিদেশে অবস্থান করে ট্রাইব্যুনাল ও রাষ্ট্রকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, মসজিদ থেকে ডেকে নিয়ে হত্যাকাণ্ড, বছরের পর বছর গুম হওয়া জনপ্রতিনিধি কিংবা ছাত্রদের রক্তের বিচার কি শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হবে? প্রোপাগান্ডা ও অর্থের প্রভাব কি ইতিহাসকে ঢেকে দিতে পারবে? ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় আজও চট্টগ্রামের মানুষ অপেক্ষা করছে।
উল্লেখ্য, জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী ভারতে পালানোর সময় গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তার দুই ছেলে এখনো পলাতক এবং তাদের বিরুদ্ধেও জুলাই অভ্যুত্থানে হামলা ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে।

