বাংলাদেশ দু’ভাগে বিভক্ত

সাম্প্রতিক একটি ছোট ঘটনা, তবে বড় প্রশ্ন—পাকিস্তানের সাথে তারেক রহমান সরকারের গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় চুক্তি। প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কি বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র? ভারতও কি বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র? এখন বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া। ২৪-এর ফ্যাসিবাদ বা শেখ হাসিনা রেজিম পরিবর্তনের ফসল ঘরে এনেছে ৭১-এর পরাজিত শক্তি।

IBN-News-Logo-Blue
By
IBN News
WE Are love for news

জসিম উদ্দিন: বাংলাদেশের রাজনীতি দু’ভাগে বিভক্ত। একটি ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, অন্যটি হলো ২৪-এর ছাত্র আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধ বানানোর পক্ষে।

সাম্প্রতিক একটি ছোট ঘটনা, তবে বড় প্রশ্ন—পাকিস্তানের সাথে তারেক রহমান সরকারের গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় চুক্তি। প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কি বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র? ভারতও কি বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র? এখন বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া।

২৪-এর ফ্যাসিবাদ বা শেখ হাসিনা রেজিম পরিবর্তনের ফসল ঘরে এনেছে ৭১-এর পরাজিত শক্তি।

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সাথে সাথে সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা, কর্মী এবং সমর্থকরা বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ থেকে বিতাড়িত হয়। ক্যাম্পাস বা ছাত্রাবাসে মব আক্রান্ত হওয়ার কারণে তারা ফিরে আসতে পারেনি। ইসলামী ছাত্র শিবির এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কর্মী-সমর্থকদের হেনস্তা ও শারীরিক নির্যাতনে এখন পর্যন্ত সারা বাংলাদেশে শতাধিক ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী নিহত হয়েছে। হাজার হাজার ছাত্রলীগ কর্মী আহত হয়েছেন।

ইউনুস সরকার কর্তৃক ছাত্রলীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় এটি একটি বড় অন্তরায়।

আজ একটি মানবিক বিপর্যয় সারা বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দেড় লক্ষ শিক্ষার্থী শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত। ২৪-এর জুলাই আন্দোলন বিরোধী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের এই সকল নেতা, কর্মী এবং সমর্থক ভুক্তভোগী।

আমি আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ৭০-এর দশক থেকে আজ পর্যন্ত সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য এক ধরনের দখলদারিত্ব ছিল। তার ধারাবাহিকতা আজও চলছে।

ছাত্র সংগঠনের দখলদারিত্বের প্রধান হাতিয়ার ছিল ছাত্রদের আবাসিক সমস্যা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনুপাতিক হারে সুযোগ পায় ঢাকার বাইরের মফস্বলের জেলার ছাত্ররা। তাদের ঢাকা শহরে বসবাস করার মতো আবাসন বা ভাড়া বাসা করার অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই।

কৃষক, মধ্যবিত্ত এবং চাকরিজীবীর সন্তানদের একমাত্র ভরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রাবাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আবাসিক হলে কক্ষ পাওয়ার একমাত্র অবলম্বন হল কর্তৃপক্ষ এবং যে ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য বা আবাসিক হল নিয়ন্ত্রণ করে, সেই ছাত্র নেতাদের শরণাপন্ন হওয়া। ছাত্র নেতারা শর্ত জুড়ে দেন—ছাত্রাবাসে কক্ষ পেতে হলে তাদের ছাত্র সংগঠনের মিছিল-মিটিংয়ে যোগদান করতে হবে।

নিরুপায় হয়ে সেই সাধারণ মফস্বল জেলার ছাত্র তার মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে আদর্শ বিসর্জন দিয়ে সেই ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে। এটাই বাস্তবতা। এটা বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র।

তেমনি আওয়ামী লীগের সতেরো বছর শাসনামলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭০ শতাংশ ছাত্র তাদের আদর্শের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের মিছিল-মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করেছিল।

২৪ জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছয় নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল কমিটির ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। তারা ছাত্রলীগের মিটিং-মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের গলা ফাটিয়েছিলেন। কারণ ওই ছয়জন মধ্যবিত্ত পরিবারের এবং কৃষক পরিবার, প্রবাসী শ্রমিকের সন্তান। তাদের ঢাকা শহরে বসবাস করার মতো আবাসন ছিল না। একমাত্র ভরসা মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রাবাস। তাই বাধ্য হয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি করতে হয়েছে। আজ তারা বাংলাদেশের আইন বানাবেন, সংসদে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। ২৪-এর জুলাই আন্দোলন করে আজ দামি গাড়ি-বাড়ি, দামি বউ নিয়ে ঢাকার শহরে বসবাস করছেন।

শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে দিল্লিতে আবাসন গড়েছেন। অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, শেখ হাসিনাকে সামরিক হেলিকপ্টারে বহন করে তিনি ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন।

বাস্তব নাকি কাল্পনিক গল্প, তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা বাংলাদেশে জামায়াত সমর্থিত ইসলামী ছাত্র শিবিরের দখল। ৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আবাসিক হল রোকেয়া হলসহ জগন্নাথ হলের শিক্ষক আবাসিক কোয়ার্টার যারা চিনিয়ে আমাদের বোনদের পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন—রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের সন্তানরা আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল নিয়েছে।

হোম মিনিস্টার উদ্দিন বলেন, ২৪-এর জুলাই আন্দোলনের পর মব সন্ত্রাসে যারা নিহত হয়েছিল, এটা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। মি. হোম মিনিস্টার, তুমি কি ৭১-এর রোকেয়া হলের আমার বোনদের যারা ধর্ষণ করার জন্য পাক বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তাদেরকে শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমা করে ভুল করেছিলেন? তার মাশুল জাতি দিচ্ছে।

আজ মূল আলোচনা হলো, বর্তমানে সেই অবস্থান পরিবর্তন হয়ে সাধারণ ছাত্ররা ইসলামী ছাত্র শিবির এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মিছিল-মিটিংয়ে যোগদান করে। মূলত সরকারের পরিবর্তন ক্যাম্পাসে দখলদারিত্বের পরিবর্তন কোনো আদর্শের পরিবর্তন বা মূল্যবোধের বিষয় নয়।

এই প্রথার পরিবর্তন করতে হবে। সাধারণ ছাত্রদেরকে তাদের চিন্তা-চেতনা ও গবেষণায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দিতে হবে। ছাত্রদের আবাসিক সমস্যার অন্তরালে তাদের মেধা, চিন্তা ও চেতনাকে বন্দি করা যাবে না।

ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার জন্য এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার শিক্ষার্থীকে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত রাখা একটি জাতির জন্য বিশাল মানবিক বিপর্যয়। গরিব-মধ্যবিত্ত পিতা-মাতার স্বপ্ন আজ ভূলুণ্ঠিত।

আমি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আহ্বান জানাব, ছাত্রদেরকে পড়াশোনা ও শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনতে। যারা ছাত্রলীগ করে অপরাধ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হোক। গণহারে সকল ছাত্রদের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত করে মব সন্ত্রাস করে ক্যাম্পাসে প্রবেশ একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ।

সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে একাডেমিক ও শিক্ষা গবেষণা কার্যক্রমের সহাবস্থান। গরিব পিতা-মাতার স্বপ্ন—তার সন্তান উচ্চ শিক্ষা নিয়ে বড় অফিসার হবে, উপার্জন করবে, সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু এক আবাসিক সমস্যার কারণে ছাত্রলীগের মিছিল-মিটিং করার দায়ে আজকে ক্যাম্পাসে যেতে পারছে না। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করতে হবে।

২৪-এর জুলাই আন্দোলনের ছয় নেতারাও ছাত্রলীগের খাঁটি কর্মী। ‘জয় বাংলা, জয় শেখ হাসিনা’ স্লোগান দিয়ে আজ সংসদে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। আমি ছাত্রলীগের পক্ষে বলছি না। আমি বলছি একটি গরিব পরিবারের সন্তানের স্বপ্নের কথা, বাবা-মায়ের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার গল্প বললাম। তারেক রহমান এর সমাধান দিতে পারেন।

ভালোবাসায় রাঙিয়ে দাও বাংলাদেশ। ভালোবাসায় এগিয়ে চলো বাংলাদেশ।

 

লেখক: জসিম উদ্দিন

লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।

Share This Article
Follow:
WE Are love for news
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version