মো. নাসির: নিউইয়র্কে পাঁচ দিন নিখোঁজ থাকার পর বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচিত মুখ ও যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি কাজী আজিজুল হক খোকনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সময় বুধবার (৭ অক্টোবর ২০২৬) রাতে নিউইয়র্ক সিটির একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি।
জানা গেছে, গত শনিবার (৩ অক্টোবর ২০২৬) থেকে কুইন্সের কিউ গার্ডেনসের ৮৪-১৫ লেফার্টস বুলেভার্ডের বাসা থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। প্রতিদিন বিকালে কিউ গার্ডেনস থেকে সাবওয়েতে ই বা এফ ট্রেন করে বাঙালি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটসের আলোচিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অবকাশে এসে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতেন তিনি। সেদিন তিনি কাজে আসেননি।
শনিবার রাত ৮টায় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের অন্যতম উপদেষ্টা ও সিনিয়র সাংবাদিক হাকিকুল ইসলাম খোকন অবকাশের অন্যতম কর্ণধার আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন সোহেল রানার কাছে খোঁজ নেন। তিনি জানান, কাজী আজিজুল হক খোকন এখনো আসেননি এবং ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। পরে রবিবার (৪ অক্টোবর) ভোরেও তাকে না পেয়ে হাকিকুল ইসলাম খোকন বাসায় ফিরে আসেন।
রবিবার বিকেল ৭টায় নবান্ন রেস্তোরাঁয় বৃহত্তর কুমিল্লাবাসীর উদ্যোগে বাংলাদেশ সোসাইটি নির্বাচন উপলক্ষে রুনু-ফিরোজ পরিষদের পক্ষে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। নৈশভোজের পর রেস্তোরাঁর এক কোণায় আলোচনা চলাকালে হোসেন সোহেল রানা এসে কাজী আজিজুল হক খোকনের বিষয়ে আলোচনা করেন।
এরপর বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম, হোসেন সোহেল রানা, হাকিকুল ইসলাম খোকন, যুক্তরাষ্ট্র পূর্বাঞ্চলীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও জাতীয় শ্রমিক লীগের সিনিয়র সহসভাপতি মনজুর চৌধুরী, জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল আহমেদ, শেখ হাসিনা মঞ্চের সিনিয়র সহসভাপতি টি. মোল্লা, আওয়ামী লীগ ও শ্রমিক লীগ নেতা এমএ আলম বিপ্লবসহ প্রায় ১০ জন বিশিষ্ট প্রবাসী তার বাসায় যান। পরে নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমদাদ চৌধুরীর নেতৃত্বে আরও পাঁচজন এবং বিএনপি নেতা মনিরের নেতৃত্বে আরও পাঁচজন যোগ দেন।
বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টে ফোনে বিস্তারিত জানালে রবিবার ভোর আড়াইটার দিকে দুইজন পুলিশ কর্মকর্তা বাসায় এসে তার রুমের দরজা খোলেন। সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি। পুলিশ কর্মকর্তারা ফিরে যান এবং দুই ঘণ্টা পর আবার এসে সোমবার খোঁজখবর জানাবেন বলে জানান।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত ৯টায় জ্যাকসন হাইটসের নবান্ন রেস্তোরাঁর চাইনিজ হলে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও সকল সহযোগী অঙ্গ সংগঠনের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান, উপদেষ্টা ড. প্রদীপ কর, হাকিকুল ইসলাম খোকন, সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন দেওয়ান, দফতর সম্পাদক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, প্রফেসর এমএ খালিক, মনজুর চৌধুরীসহ শতাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। এরপর স্বজন, পরিচিতজন ও বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা বিভিন্নভাবে তার সন্ধান চালান এবং হাসপাতালগুলোতেও খোঁজ নেন।
কাজী আজিজুল হক খোকন কিউ গার্ডেনসের বাসায় একটি রুমে একাই বসবাস করতেন এবং জ্যাকসন হাইটসের অবকাশ দোকানে কাজ করতেন। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন। তার দেশের বাড়ি বাংলাদেশের মাগুরা জেলায়। তিনি মাগুরা জেলা সমিতি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে কিংবা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে—এমন নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে এসবের কোনোটিই নিশ্চিত ছিল না।
মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পরও তার পরিচয় ও পারিবারিক তথ্যের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় মরদেহ নিউইয়র্ক সিটি চিফ মেডিকেল এক্সামিনারের কার্যালয়ে রাখা হয়েছে। মৃত্যুর কারণ এখনো অজানা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মেডিকেল পরীক্ষা ও তদন্তের পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাত ৮টায় নবান্ন রেস্তোরাঁয় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ, সকল সহযোগী অঙ্গ সংগঠনসহ প্রবাসের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী, সাংবাদিক, কবি, মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ মাগুরা জেলাবাসী প্রায় দুই শতাধিক প্রবাসীর এক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
কাজী আজিজুল হক খোকনের জানাজা গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর নিউইয়র্কের ডায়মন্ড সিটি প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ সোসাইটির উদ্যোগে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাতে তার মরদেহ বাংলাদেশের মাগুরায় পাঠানো হয়েছে।

