উত্তরায় বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত: নিহত ১৯, আহত দেড়শতাধিক, শোকের ছায়া রাজধানীজুড়ে

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহেদ কামাল ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলনে জানান, এখন পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, যার মধ্যে একজন পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম সাগর এবং একজন তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রয়েছেন। আহতের সংখ্যা ১৬৪-এর বেশি, যাদের বেশিরভাগই শিশু শিক্ষার্থী। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

By
IBN News
A New York-based Media Outlet under IBN Inc. We are the Favorite Choice for the Global Bengali Community, We are Committed to delivering Unbiased News &...
ছবি সংগৃহীত।

ঢাকা, ২১ জুলাই ২০২৫: রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফ-৭ বিজেআই প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত ১৯ জন নিহত এবং দেড়শতাধিক আহত হয়েছেন। সোমবার দুপুর ১টা ৬ মিনিটে উড্ডয়নের মাত্র ১২ মিনিট পর বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, যা ঢাকার সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি।

যেভাবে প্রশিক্ষণ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়:

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, বিমানটি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বীর উত্তম এ.কে. খন্দকার ঘাঁটি থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ মিশনে উড্ডয়ন করে। উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার হল নামক দোতলা ভবনের ক্যান্টিনের ছাদে আছড়ে পড়ে। বিধ্বস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমানটিতে আগুন ধরে যায়, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়।

ঘটনাস্থলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিমানটি পড়ার সময় বিকট শব্দ হয় এবং আগুনের ধোঁয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মাইলস্টোন কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদ বলেন, “বিমান বিধ্বস্তের সময় প্রথম থেকে সপ্তম শ্রেণির ক্লাস চলছিল। বিকট শব্দে শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। শিক্ষকরা দ্রুত শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।”

দূর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা:

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহেদ কামাল ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলনে জানান, এখন পর্যন্ত ১৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, যার মধ্যে একজন পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম সাগর এবং একজন তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রয়েছেন। আহতের সংখ্যা ১৬৪-এর বেশি, যাদের বেশিরভাগই শিশু শিক্ষার্থী। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট, জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতাল (সিএমএইচ), উত্তরা আধুনিক হাসপাতাল, এবং কুয়েত বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ৭০ জনের বেশি আহত ভর্তি রয়েছেন।

দূর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা:

দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট এবং ৬টি অ্যাম্বুলেন্স ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, এবং বিজিবির তিনটি প্লাটুন সমন্বিতভাবে উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নেয়। হেলিকপ্টারের মাধ্যমেও আহতদের উদ্ধারে সহায়তা করা হয়। দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। ধ্বংসাবশেষ সরাতে ক্রেন ব্যবহার করা হচ্ছে।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী ফাহিম হোসেন বলেন, “মাত্র ১০ ফুট দূর থেকে আমি বিমানটি ভবনের নিচতলায় আঘাত হানতে দেখেছি। চিৎকার আর ধোঁয়ায় পুরো এলাকা ভরে যায়।” আরেকজন শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম জানান, “সপ্তম তলা থেকে দেখলাম, আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম।”

হতাহতের সংখ্যা এড়াতে যে প্রচেষ্টা করেছিলেন বিমানটির পাইলট:

আইএসপিআরের বিবৃতি অনুযায়ী, পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলাম সাগর বিমানটিকে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে জনবিরল এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। তবে, কম উচ্চতার কারণে তিনি ইজেক্ট করতে পারেননি এবং দুর্ভাগ্যবশত নিহত হন।

বিমান বিধ্বস্তের পর সরকারি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া:

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এই ঘটনাকে “মর্মান্তিক” ও “জাতির জন্য বেদনার ক্ষণ” উল্লেখ করে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকার ২২ জুলাই একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। এদিন সারাদেশে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।

আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে বিমানবাহিনীর একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এই ঘটনা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, জাপানের দূতাবাস, জাতিসংঘ, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন শোক প্রকাশ করেছে এবং সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রয়টার্স, হিন্দুস্তান টাইমস, গালফ নিউজ, এবং স্ট্রেইটস টাইমসসহ বিশ্বের প্রধান সংবাদমাধ্যম এই দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ করেছে।

স্থানীয় পরিস্থিতি ও অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা:

দুর্ঘটনার পর মাইলস্টোন কলেজের চারপাশে হাজারো অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষ ভিড় করেন। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের খুঁজে পাননি। একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রজ্জব আলী নিলয়ের মা নিলুফা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “আমার ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছি না। আমাকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।” নিরাপত্তার কারণে কলেজ ক্যাম্পাসে অভিভাবকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট একটি জরুরি হটলাইন (০১৯৪৯-০৪৩৬৯৭) চালু করেছে। আহতদের পরিবহনের জন্য মেট্রো রেলের একটি কোচ সংরক্ষণ করা হয়েছে। রক্তদানের জন্য স্থানীয়দের হাসপাতালে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এক নজরে এফ-৭ বিজিআই বিমান:

এফ-৭ বিজেআই হলো চীনের চেংডু জে-৭/এফ-৭ সিরিজের একটি প্রশিক্ষণ বিমান, যা সোভিয়েত মিগ-২১ এর লাইসেন্সকৃত সংস্করণ। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ২০১৩ সালে এই বিমান সংগ্রহ করে। আইএসপিআর জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটনের জন্য তদন্ত চলছে এবং বিস্তারিত তথ্য পরবর্তীতে জানানো হবে।

এই দুর্ঘটনা রাজধানী ঢাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে। স্কুল ক্যাম্পাসে এমন মর্মান্তিক ঘটনা শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এবং শিক্ষকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সরকার এবং বিমানবাহিনী হতাহতদের সর্বাত্মক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এই দুর্ঘটনার কারণ ও ভবিষ্যৎ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Share This Article
Follow:
A New York-based Media Outlet under IBN Inc. We are the Favorite Choice for the Global Bengali Community, We are Committed to delivering Unbiased News & an Accurate Portrayal of Global Events.
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Exit mobile version