হাকিকুল ইসলাম খোকন, বাপসনিউজ: বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক ও কথাসাহিত্যিক শাম্মী তুলতুল। চট্টগ্রামের মাটি থেকে উঠে এসে দুই বাংলার সাহিত্যাঙ্গনে নিজস্ব আলো ছড়িয়ে দেওয়া এক নাম—শাম্মী তুলতুল। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে যাঁরা বহুমাত্রিক পরিচয়ে কাজ করছেন, তাঁদের মধ্যে তিনি নিঃসন্দেহে আলোচিত একজন জনপ্রিয় লেখক ও কথাসাহিত্যিক।
একটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিবারে তার জন্ম। পারিবারিক ইতিহাসেই যেন লুকিয়ে আছে সাহিত্যচর্চার বীজ। তাঁর দাদা আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা, লেখক এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাল্যবন্ধু। নানী কাজী লতিফা হক বেগম পত্রিকার সুপরিচিত লেখিকা ছিলেন। শাম্মী তুলতুলের বেড়ে ওঠা ছিল চিন্তা, চেতনা ও সংস্কৃতির আলোকিত পরিমণ্ডলে।
শৈশবে তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত ও ডানপিটে স্বভাবের। নাচ, গান, আবৃত্তি, খেলাধুলা সবকিছুতেই ছিল সমান আগ্রহ। তবে সময়ের সাথে লেখালেখিই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান পরিচয়। বর্তমানে তিনি একাধারে লেখক, উপন্যাসিক, গল্পকার, শিশুসাহিত্যিক, নজরুল অনুরাগী, রেডিও-টিভি-ইউটিউবসহ অনলাইন প্রেজেন্টার, খবর পাঠক, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট, ভয়েস প্রেজেন্টার ও মডেল। এই বহুমাত্রিক পরিচয় তাঁর সৃজনশীলতার বিস্তারকেই তুলে ধরে।
লেখালেখির জগতে শক্ত অবস্থান: তিনি ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের প্রথম সারির পত্রিকায় লিখছেন। যেমন: প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, সমকাল, যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন, প্রতিদিনের সংবাদ, খোলা কাগজ, সরকারি পত্রিকা শিশু, নবারুণ প্রভৃতি।
বিদেশের মাটিতেও তাঁর শক্ত অবস্থান রয়েছে। প্যারিস, কানাডা, নিউইয়র্ক, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, জার্মানির বাংলা পত্রিকায় লিখে আন্তর্জাতিক গৌরব অর্জন করেছেন। আমেরিকায় তাঁকে নিয়ে বিশাল সাক্ষাৎকারও প্রকাশিত হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সংবাদ সংস্থা বাপসনিউজ, এনওয়াইবিডিনিউজ এবং জনপ্রিয় বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পোর্টাল আইবিএন নিউজ এর সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
প্রকাশিত গ্রন্থ ও জনপ্রিয়তা: এ পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৭টি। ২০২২ সালের কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘নরকে আলিঙ্গন’ পাঠকমহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং বর্তমানে ভারতের জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ফ্লিপকার্টে পাওয়া যাচ্ছে।
তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘চোরাবালির বাসিন্দা’, ‘পদ্মবু’, ‘মনজুয়াড়ি’, ‘একজন কুদ্দুস ও কবি নজরুল’—যেগুলো পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে বেস্টসেলার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিটি বইয়ে তিনি বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষণীয় বার্তা রাখার চেষ্টা করেন, যা তাঁর লেখাকে কেবল গল্প নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমেও পরিণত করেছে।
শিশুসাহিত্য ও মিডিয়া উপস্থিতি: শিশু-কিশোর সাহিত্যে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। তাঁর লেখা ‘পিঁপড়ে ও হাতির যুদ্ধ’ গল্পটি দীপ্ত টিভিতে নাট্যরূপে প্রচারিত হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর রচনায় নির্মিত ‘লাল শরবত’ নাটক সম্প্রচারিত হয়েছে সিটি এফএম-এ। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর একটি গল্প ভারতে গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে—যা তাঁর সাহিত্যকর্মের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নির্দেশ করে।
তাঁর বই বাংলাদেশের বৃহত্তম অনলাইন বইয়ের বাজার রকমারি.ডটকম, প্রথমা, দারাজসহ সব অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যায়। এছাড়া রবি বইঘর অ্যাপ, বাংলালিংক এয়ারটেল অ্যাপে ই-বুক আকারেও পাঠকরা তাঁর বই পড়তে পারেন।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা: লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এর মধ্যে রয়েছে: মাদার তেরেসা অ্যাওয়ার্ড, মহাত্মা গান্ধী পিস অ্যাওয়ার্ড, সাউথ এশিয়া গোল্ডেন পিস অ্যাওয়ার্ড, নজরুল অগ্নিবীণা সাহিত্য পুরস্কার, সোনার বাংলা সাহিত্য সম্মাননা, রোটারি সম্মাননা, উইমেন পাওয়ার লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০২৫, ময়ূরপঙ্খী স্টার অ্যাওয়ার্ড ২০২৫, খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক সম্মাননা।
খাগড়াছড়ির পাঠকসমাজ ভালোবেসে তাঁকে ‘রাজকন্যা’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। সেখানে পরপর দুবার একক বইমেলার আয়োজন করেছে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন। সম্প্রতি তিনি রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে রবীন্দ্র রত্ন পুরস্কার ২০২৬ লাভ করেছেন।
সম্প্রতি বেগম রোকেয়া চরিত্রে একটি ম্যাগাজিনের কভার মডেল হিসেবে উপস্থিত হয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন—যা তাঁর বহুমাত্রিক সত্তারই আরেকটি দৃষ্টান্ত।
সংগ্রাম ও দর্শন: সামাজিক ও পারিবারিক নানা বাধা অতিক্রম করে নিজের অবস্থান তৈরি করার যে সংগ্রাম, সেটিই শাম্মী তুলতুলের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। তাঁর লেখালেখি কেবল সৃজনশীলতার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং আত্মবিশ্বাস, প্রতিরোধ এবং সামাজিক বার্তারও ধারক।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শাম্মী তুলতুল বলেন, “লেখালেখি তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়—এটি দায়বদ্ধতা, মানুষের হৃদয়ে আলো পৌঁছে দেওয়ার এক অবিরাম প্রয়াস।” তিনি বিশ্বাস করেন, সাহিত্য মানুষের ভেতরের অন্ধকার দূর করে আলো জ্বালাতে পারে। প্রতিটি বইয়ে বিনোদনের সঙ্গে শিক্ষণীয় বার্তা রাখতে চান। পাঠকের হৃদয়ে পরিবর্তন আনাই তাঁর কাছে বড় অর্জন।
নারী হিসেবে পথচলায় নানা প্রতিবন্ধকতা ও সামাজিক বাধার মুখোমুখি হওয়ার কথা তিনি অকপটে স্বীকার করেন। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিকূলতাই মানুষকে শক্ত করে। পিছুটান নয়, সামনে এগিয়ে যাওয়াই তাঁর লক্ষ্য। তাঁর এই প্রয়াস অব্যাহত থাকবে—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন শুভানুধ্যায়ীরা।

